তকমায় বাড়বে ক্রিপ্টোর বাজার?
এই সময়: ২০১৬ সালে ২৯ বছর বয়সী হিতেন মালব্য যখন প্রথম বিটকয়েনে লগ্নি করেন তখন ওই ভার্চুয়াল মুদ্রার প্রতিটির দাম ছিল ১০০০ ডলারেরও কম। হিতেনের ৪০০০০ টাকার প্রাথমিক লগ্নি এক বছরের মধ্যে তাঁকে 'ক্রিপ্টো মিলিওনেয়ার' করে তোলে। ২০১৭ সালের শেষ দিকে বিটকয়েনের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২০০০০ ডলার!
কিন্তু, তার পরের বছরই অর্থাৎ ২০১৮ সালে হিতেনকে ৮০% লোকসানের মুখ দেখতে হয় -- বিটকয়েনের দাম পড়ে আসে ৩০০০ ডলারে। অথচ, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিজের ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্টেও হাত দেওয়ার উপায় ছিল না হিতেনের। অ্যাকাউন্টে থাকা বিটকয়েন বিক্রি করে ওই অর্থ যে ব্যাঙ্ক থেকে টাকায় ভাঙিয়ে নেবে সে পথ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বন্ধ করে দিয়েছিল। হিতেনের কথায়, 'সেই সময়টা আমার জন্য ছিল চরম আর্থিক ও সামাজিক দুর্যোগের। ক্রিপ্টোকারেন্সিকে তখন সকলে বেআইনি বলে মনে করত।'
ক্রিপ্টোকারেন্সির আইনি অবস্থান এখনও ধূসর। কিন্তু, বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন সর্বজনবিদিত। কোভিড অতিমারীর সময় স্বল্পমেয়াদে বহুগুণ রিটার্ন পাওয়ার লক্ষ্যে বহু ভারতীয় চরম উদ্বায়ী এই ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লগ্নি করা শুরু করেন। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের মতে, প্রায় ১.৫ কোটি ভারতবাসী ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লগ্নি করেছেন।
ক্রিপ্টোকারেন্সির এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এ বছর গোড়ার দিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। 'প্রাইভেট ক্রিপ্টোকারেন্সি' নিষিদ্ধ করতে সংসদে বিল আনা হবে বলে গত মাসে কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করে। তবে, যে প্রযুক্তিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি তৈরি সেই প্রযুক্তিকে উৎসাহ দেওয়া হবে বলেও সরকার সংসদে জানায়।
সরকারের ওই ঘোষণা ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের শঙ্কিত করে তোলে। ধস নামে ভারতের ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে। ভারতে ক্রিপ্টো ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষ সংগঠন ব্লকচেন এবং ক্রিপ্টো অ্যাসেটস কাউন্সিলের সহ-সভাপতি আশিস সিঙ্ঘল বলেন, 'ক্রিপ্টোকারেন্সিকে একটি অ্যাসেট হিসাবে মান্যতা দেওয়া উচিত। ফিনান্সিয়াল অ্যাসেট হিসাবেই ক্রিপ্টো বিশ্বের বহু দেশে নিয়ন্ত্রিত। ক্রিপ্টোর বহুল ব্যবহার লেনদেনের মাধ্যম মুদ্রা হিসাবে নয়, বরং অ্যাসেট হিসাবেই।'
ইতিমধ্যে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন বুধবারই শেষ হয়েছে এবং এই অধিবেশনে সরকার কোনও ক্রিপ্টো বিল সংসদে পেশ করেনি। এদিকে, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়ে গত সপ্তাহে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার কেন্দ্রীয় বোর্ডকে সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ক্রিপ্টোকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত, আংশিক নিষেধাজ্ঞায় কাজের কাজ কিছুই হবে না।
দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ কয়েনডিসিএক্সের সহ প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও তথা ব্লকচেন এবং ক্রিপ্টো অ্যাসেটস কাউন্সিলের অন্যতম সহ-সভাপতি সুমিত গুপ্তা বলেন, 'গোটা বিশ্বে ডিসেন্ট্রালাইজড ফিনান্স ব্যবস্থার প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ফিনান্সিয়াল অ্যাসেট হিসাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বেড়েছে।' তিনি আরও বলেন, বিশ্বজুড়ে ব্লকচেন এবং ডিসেন্ট্রালাইজড ফিনান্স প্রোটোকলে সুরক্ষিত রাখা বিভিন্ন ফিনান্সিয়াল অ্যাসেটের পরিমাণ গত বছর অক্টোবর মাসের ১১০০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে এ বছর মে মাসে হয়েছে ৮৬০০ কোটি ডলার। এর কারণ, ডিসেন্ট্রালাইজড ফিনান্স প্রোটোকলে রাখা ক্রিপ্টো অ্যাসেট খুব সহজেই বন্ধক রেখে বা বিক্রি করে নগদ পাওয়া যেতে পারে এবং এতে কোনও 'কাউন্টার পার্টি রিস্ক' থাকে না। সরকার যদি সঠিক ও স্বচ্ছ বিধিনিয়ম প্রণয়ন করে তবে এ দেশেও ফিনান্সিয়াল অ্যাসেট হিসাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার প্রভূত বাড়বে।
আরও জানতে লগ ইন করুন
- দেশের স্থানীয় ক্রিপ্টো ইন্ডাস্ট্রি লেনদেনের মাধ্যম হিসাবে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মুদ্রার মান্যতা দেওয়ার বিরূদ্ধে
কেবল 'অ্যাসেট' হিসাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারকে মান্যতা দেওয়া হোক বলে তাদের দাবি। স্থানীয় ক্রিপ্টো ইন্ডাস্ট্রির মতে, ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন কোনও নিয়ামক সংস্থার নজরদারির অধীনে এলে বিনিয়োগকারীরা সুরক্ষা পাবেন, সরকারের কর আদায় বাড়বে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি বেআইনি ব্যবহার বন্ধ হবে
এপ্রিল ২০১৮: দেশের ব্যাঙ্কগুলিকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন করতে নিষেধ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের
মার্চ ২০২০: ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশকে খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট
জানুয়ারি ২০২১: বেসরকারি ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিল আনা হবে বলে জানায় কেন্দ্রীয় সরকার
- নভেম্বর ২০২১: সংসদে ক্রিপ্টো বিল আনা হবে বলে জানায় সরকার। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সাফ জানিয়ে দেন, ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মুদ্রার মান্যতা দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কোনও কিছু কেনাবেচা করা যাবে না
ডিসেম্বর ২০২১: কেন্দ্রীয় বোর্ডের বৈঠকে ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞার পক্ষে সওয়াল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের
ক্রিপ্টোকারেন্সি হল এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা যার মাধ্যমে সুরক্ষিত অথচ অনেক সস্তায় লেনদেন করা যায় ব্যক্তি পরিচয় গোপন রেখেই। কোনও কেন্দ্রীয় নিয়ামক সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নেই ক্রিপ্টোকারেন্সির উপর। যে কোনও একটি স্থানীয় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে আপনিও সহজেই বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা করতে পারেন
- রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতো কোনও কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যু করে না। ফলে, ক্রিপ্টোকারেন্সিতে সরকারের কোনও অঙ্গীকার বা গ্যারান্টি থাকে না। ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বর্তমান অর্থব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক মনে করা হয়
- যেহেতু ব্যক্তি পরিচয় গোপন রেখেই ক্রিপ্টোকারেন্সিতে আন্তর্জাতিক স্তরে লেনদেন করা যায়, তাই এর মাধ্যমে মানি লন্ডারিং, জঙ্গি ও ড্রাগ-অস্ত্র ফিনান্সিংয়ের প্রভূত সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার
গোটা বিশ্বে ডিসেন্ট্রালাইজড ফিনান্স ব্যবস্থার প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ফিনান্সিয়াল অ্যাসেট হিসাবে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বেড়েছে।
সুমিত গুপ্তা, সহ-প্রতিষ্ঠতা, কয়েনডিসিএক্স