এই সময়: ২০০৯ সালে বিশ্বের প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিটকয়েন, বাজারে আসার চার বছর পর ২০১৩ সালে বড়দিনের আগের দিন ক্রিপ্টোকারেন্সির আর্থিক, আইনি ও সুরক্ষার ঝুঁকি নিয়ে একটি সতর্কবার্তা জারি করেছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এর পরের আট বছরে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের উদ্বেগ বেড়েছে বই কমেনি। এ মাসের গোড়ায় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তার সেন্ট্রাল বোর্ডকে সাফ জানিয়ে দেয়, 'ক্রিপ্টোকারেন্সি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন, আংশিক নিয়ন্ত্রণ করা অর্থহীন।' বস্তুত, ২০১৮ সালে ব্যাঙ্কগুলি যাতে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে কোনও রকম লেনদেনে না জড়ায় তা নিয়ে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছিল আরবিআই। কিন্তু, দু'বছর পর ২০২০ সালে সুপ্রিম কোর্ট আরবিআইয়ের ওই নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দেয়।
তা সত্ত্বেও যখনই ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচায় অনুমোদনের কথা উঠেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছে, এতে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়বে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মানিটরি পলিসি কার্যকারিতা হারাবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিয়ন্ত্রিত ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির অবক্ষয় ঘটিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি দেশের অর্থ ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলতে পারে। ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন এবং লেনদেনকারীদের শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব বলে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ড্রাগ-অস্ত্র-নারী পাচারের মতো বেআইনি কার্যকলাপ রমরমিয়ে বাড়ছে। সেটাও মাথাব্যথার অন্যতম কারণ।
তাছাড়া, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে প্রচুর বিদেশি অর্থ ঢুকলে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পক্ষে টাকার বিদেশি মুদ্রায় বিনিময় দর ম্যানেজ করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। এমনকী, আইএমএফের মুখ্য অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথও সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে উন্নয়নশীল ও ইমার্জিং অর্থনীতিগুলি বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তাই, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক চায় না ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মুদ্রা অথবা আর্থিক সম্পত্তি কোনওটিরই মান্যতা দেওয়া হোক, বিশেষ করে বেআইনি কাজ-কারবারে যখন অনায়াসেই এই ডিজিটাল কারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাচারের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
সব পক্ষের ঐকমত্য না হওয়ায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ভারত সরকারও তার অবস্থান এখনও সুস্পষ্ট করতে পারেনি। যে কারনে, ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে একটি বিল সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেই আনা হতে পারে বলেও সরকার সেই বিল পেশ পিছিয়ে দিয়েছে, অন্তত সংসদের পরবর্তী বাজেট অধিবেশন অবধি।
উল্লেখ্য, এ বছর চিনে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে সরকার। একটি ফিনটেক সংস্থার কথায়, কেন্দ্রের একাংশের মত, ভারতও যদি ক্রিপ্টোকারেন্সিকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে তবে, গোটা বিশ্ব থেকে ভারতকেও চিনের মতো বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে লেনদেনের মাধ্যম হিসাবে টাকা পয়সার মতো আইনি মুদ্রার মান্যতা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবে, ক্রিপ্টোকারেন্সিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করাটাও সম্ভব নয়, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তাঁদের মতে, সরকারকে একটি ভারসাম্যের নীতি নিতে হবে যাতে, একদিকে দেশের যত নাগরিক ক্রিপ্টোকারেন্সিতে ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছেন তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, এবং অন্যদিকে, এই ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবসাকেও লাগামছাড়া বাড়তে না দেওয়া হয়।
লক্ষ্মীকুমারণ অ্যান্ড শ্রীধরণ অ্যাটর্নিজ় সংস্থার এগজিকিউটিভ পার্টনার এল বদ্রিনারায়ণের কথায়, 'সরকার ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বিনিয়োগের বিকল্প উপায় হিসাবে মান্যতা দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ামকের নজরদারিতে আনার করার কথা বিবেচনা করছে। ফলে, আয়কর আইনের আওতায় ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার উপর ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স বসতে পারে। তবে, ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার উপর জিএসটি বা টিডিএস বসবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।'
বদ্রিনারায়ণ আরও বলেন, 'রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমতি বিনা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিদেশে পাঠানোও বন্ধ করা হতে পারে।' তবে, তিনি স্বীকার করেন, বিদেশে থাকা ভারতীয়দের ক্রিপ্টোয় লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করা যথেষ্ট কঠিন।
ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলিও সরকারের কাছে বিদেশি মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও কর আইন স্পষ্টিকরণের দাবি জানিয়েছে। কয়েনডিসিএক্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সুমিত গুপ্তা বলেন, 'ফেমা আইন অনুযায়ী, পণ্য বা পরিষেবা বিদেশে পাঠালে বা আনলে তা রপ্তানি বা আমদানি হিসাবে বিবেচ্য হয়। কিন্তু, ক্রিপ্টো টোকেন একটি 'পণ্য' হিসাবে বিবেচ্য হবে কি না আইনে সে বিষয়ে কিছু বলা নেই।'